মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১, ১২ শ্রাবণ, ১৪২৮, ১৬ জিলহজ, ১৪৪২
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও তার ছেলে শ্রেণীকক্ষ ভেঙ্গে জায়গা দখলের চেষ্ঠা, দোষীদের শাস্তির দাবী শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও তার ছেলে শ্রেণীকক্ষ ভেঙ্গে জায়গা দখলের চেষ্ঠা, দোষীদের শাস্তির দাবী শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর

গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হাতিয়াড়া হাই স্কুলের দানকৃত জায়গা স্কুলেরই টাকা খরচ করে নিজ ও ছেলের নামে করে নিয়েছেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মো: আব্দুল হামিদ। এমনকি শ্রেনী কক্ষ ভেঙ্গে জায়গা দখল করারও চেষ্ঠা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী। জায়গা দখল ও শ্রেনীকক্ষ ভাঙ্গায় তার ছেলে ছাওবান মোল্যাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সরেজমিনে স্কুলে গিয়ে জানাগেছে, ১৯৯৪ সালে কাশিয়ানী হাতিয়ারায় এলাকাবাসীর দানকৃত জায়গায় হাতিয়াড়া হাই স্কুল নামে একটি স্থলে গড়ে তোলেন জেলা জামায়েত ইসলামীর সাবেক আমীর মো: আব্দুল হামিদ। এরপর ১৯৯৮ সালে স্কুলটি এমপিওভুক্ত হয়।

কিন্তু কৌশলে স্কুলের টাকা খরচ করে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও জেলা জামায়েত ইসলামীর সাবেক আমীর মো: আব্দুল হামিদ নিজ নামে দলিল করে নেন। পরে তিনি স্কুলের জমি তার ছেলে ছাওবান মোল্যার নামে করে দেন। এরপরই করোনার কারনে স্কুল বন্ধ থাকার সুযোগে ছাওবান মোল্যা ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী গত ১৩ জুন সকালে স্কুলের ৮টি শ্রেণী কক্ষবিশিষ্ট দু’টি টিনসেড ঘর ভেঙ্গে ও ১২টি গাছ কেটে জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরী কাজ শুরু করে। এমনকি স্কুলের পাশের একটি পুকুরও ভারাট করে দখল করার চেষ্ঠা করে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো: মোক্তার হোসেন, হাতিয়াড়া ইউপি-চেয়ারম্যান দেবদুলাল বিশ্বাস ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিত কুমার মৈত্রের উপস্থিতিতে হাতিয়াড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওই স্কুলের অভিভাবক-সদস্য মো: বাদশা মোল্যা বাদী হয়ে কাশিয়ানী থানায় একটি মামলা (নং-১৭/১১৪) করেন। পরে ওই দিন রাতেই পুলিশ জামায়েত ইসলামীর সাবেক আমীর মো: আব্দুল হামিদের ছাওবান মোল্যাকে (৩৫) গ্রেফতার করে।

বুধবার দুপুরে তাকে গোপালগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়। এ ঘটনা পর থেকে বুধবার সকাল থেকে দোষীদের শাস্তির দাবীতে বিক্ষোভ-মিছিল ও সমাবেশসহ আন্দোলন শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। তারা দ্রু দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান।

ওই স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র সবুজ মোল্যা, নবম শ্রেনীর ছাত্রী লুবানা খানম ও পিংকি বিশ্বাস বলেন, স্কুলের প্রতিষ্ঠা মো: আব্দুল হামিদের ছেলে ছাওবান মোল্যা আমাদের শ্রেনী কক্ষ ভেঙ্গে স্কুলের জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরী করেছে। এমনকি স্কুলের মাঝে একটি বেড়াও দিয়ে দিয়েছে। এখন আমাদের স্কুলে আসা যাওয়া করতে সমস্যায় পড়তে হবে। এছাড়া স্কুল খুললে আমরা ক্লাশ করতে পারবো না। আমারা এ ঘটনার সুস্থ বিচার চাই।

সাবেক স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য শাহাদাত হোসেনসহ স্কুলের জমি দাতারা বলেন, এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য মো: আব্দুল হামিদ আমাদের কাছে জমি চান। এলাকার মানুষ এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠার জন্য স্কুলের নামে জমি দান করেন। কিন্তু তিনি কৌশলে স্কুলের জমির স্কুলের নামে না করিয়ে নিজের নামে করে নেন। পরে সেই জমি তিনি তার ছেলের নামে করে দেন। এরপরই তার ছেলে নামে ছাওবান মোল্যারন নামে করে দিলে সেই এই স্কুল ক্লাশ রুম ভেঙ্গে ফেলে স্কুলের জায়গা দখল করতে স্থাপনা তৈরী শুর করে। এমনকি এই স্কুলের মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যায়। আমার এঘটনার সুষ্ঠ বিচার চাই।

হাতিয়াড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ কুমার মৈত্র বলেন, স্কুল ঘর ভেঙ্গে ফেলায় আমার শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী খুবই মর্মাহত হয়েছি। শ্রেনী কক্ষ ভেঙ্গে ফেলায় স্কুল খুললে আমরা আর ক্লাশ নিতে পারেবা না। এতে শিক্ষার্থীরা অসুবিধায় পড়বে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা আতংকে রয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।

হাতিয়ার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেব দুলাল বিশ্বাস বলেন, এটি একটি জঘন্য ঘটনা। এ ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো: মোক্তার হোসেনকে সাখে নিয়ে হাতিয়াড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওই স্কুলের অভিভাবক-সদস্য মো: বাদশা মোল্যা বাদী হয়ে কাশিয়ানী থানায় একটি মামলা (নং-১৭/১১৪) করেছেন। এমন ঘটনা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও জেলা জামায়েত ইসলামীর সাবেক আমীর মো: আব্দুল হামিদ বলেন, আমি হাতিয়ারা হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের দানকৃত এক একর জমির উপর স্কুলটি গড়ে তুলি এবং দলিল করে দিয়েছি। স্কুলের মাঠের সামনে আমারসহ আরো অনেকেরই ব্যক্তিগত জমি রয়েছে। এ জমিগুলো আমি কিনে নিয়েছে। পরে অনেকদিন আগিই আমার ক্রয়কৃত জমি আমার ছেলে ছাওবানকে দলিল করে দিয়েছি। তবে এই জমি নিয়ে আগে থেকেই কোন্দল রয়েছে। আমরা অন্যের বা কোন প্রতিষ্ঠানের জায়গা দখল করবো এটা আমাদের চিন্তারও বাইরে। আমার ছেলে স্কুলের জমি দখল করেনি। সে তার নিজের জমির উপর স্থাপনা তৈরী করছিল।

তিনি আরো বলেন, একটি মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় আমাকে প্রধান আসামী করা হয়েছে। আমার ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি আইনগতভাবে বিষয়টি দেখবো।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামদিয়া পুলিশ ফাড়িঁর পরিদর্শক কামাল হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এলাকার জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ছাওবানের পিতা আব্দুল হামিদকে প্রধান আসামী করে ১৭ জন নামীয় ও আরও অজ্ঞাত ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ছাওবানের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

গোপালগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর সার্কেল) মো: শাহীনুর চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় আসামী ছাওবান মোল্যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা দ্রুত বাকি আসামদের গ্রেফতার করতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রথীন্দ্র নাথ রায় বলেন, স্কুলের শ্রেনী কক্ষ ভেঙ্গে ফেলে জায়গা দখলের বিষয়টি আমি জেনিছে। এ ব্যাপারে একটি মামলাও হয়েছে। তবে, স্কুল খুললে শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ক্লাশ করতে পারে সেজন্য শ্রেনী কক্ষ তৈরীসহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়া হবে।


error: Content is protected !!