মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১, ১২ শ্রাবণ, ১৪২৮, ১৬ জিলহজ, ১৪৪২
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১

যশোরের নারী শিক্ষার অগ্রদুত মাহমুদা রহমানের কথা আমরা ভুলে গেছি ……..

যশোরের নারী শিক্ষার অগ্রদুত মাহমুদা রহমানের কথা আমরা ভুলে গেছি ……..

যশোর: যুদ্ধে একমাত্র শহীদ জাতীয় পরিষদ সদস্য যশোরের মসিয়ুর রহমানের স্ত্রী ছিলেন মিসেস মাহমুদা রহমান। তাঁর জন্ম ১৯২৭ সালে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ছিল বগুড়ার আধাবাড়িয়ার চন্দন বাইশা গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন মফিজ উদ্দীন ফকির ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট, তিনি বাংলা, ইংরেজি, তেলেগু, আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় বিশেষ ব্যুপত্তি লাভ করেছিলেন। তাই মাহমুদা রহমানের লেখাপড়া শিখতে হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। কিশোরগঞ্জ গালর্স হাইস্কুল, বহরমপুর মিশনস্কুল, বহরমপুর গালর্স স্কুল, বগুড়া ভি এম গালর্স স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৬ এ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজ থেকে আইএ প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেন। ১৯৫০-এ অনিয়মিত বিএ পরীক্ষায় পাশ করেন। খেলাধুলার নানা প্রতিযোগিতায় তিনি অনেক ভালো করেছেন। যেমন ব্রতচারী নাচ, গালর্স গাইড, ছাত্রী প্রতিনিধিত্ব ছাড়াও বাসকেট বল, জ্যাভলিন থ্রো, রিলে রেস প্রভৃতি খেলায় অপরাজিতা ছাড়াও হ্যান্ড রাইটিং ও রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হতেন।
বিএ পাশ করার পর চট্টগ্রামের খাস্তগীর গভ: হাই স্কুলে দু’মাস শিক্ষকতা করেন। তাঁর ভগ্নিপতি সরকারি চাকরি করতেন। তিনি চট্টগ্রাম থেকে যশোরে বদলী হয়ে এলে মাহমুদা রহমান চাকরি ছেড়ে ভগ্নিপতির সাথে যশোরে আসেন। এরপর যশোরে থাকাকালে তিনি মোমিন গালর্স স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন (১৯৩৫ সালে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোঃ মোমিন উদ্দীনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও যশোর ঘোপের ইয়াহিয়া খানসহ আগ্রহী শিক্ষনুরাগী ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় ‘মোমিন গার্লস স্কুল’ নামে এ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালে এ প্রতিষ্ঠান (মোমিন গার্লস স্কুল) টি সরকারি করা হয় এবং স্কুলের নতুনভাবে নামকরণ করা হয় ‘যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। তবে এ জনপদের প্রতিটি মানুষের কাছে এখনও প্রতিষ্ঠানটি ‘মোমিন গার্লস স্কুল’ নামে ব্যাপক পরিচিত।) ইয়াহিয়ার অনুরোধে মাহমুদা রহমান স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষায়িত্রী হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষায়িত্রী হন। ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট তাঁর সাথে মসিয়ুর রহমানের বিবাহ হয়। বিয়ের পর স্বামীর উৎসাহে তিনি ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন। পরের বছর ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৪ সালে লন্ডনে স্কলারশীপ নিয়ে শিক্ষা ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বামী মসিয়ুর রহমান পাক আর্মি কর্তৃক ধৃত ও নির্মমভাবে নিহত হবার পর জীবনসঙ্গী বিয়োগে শোকাকুল হয়ে পড়েন এবং মোমিন গালর্স স্কুলের প্রধান শিক্ষায়িত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি যশোর থেকে ঢাকা চলে যান। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যা হিসাবে নিযুক্ত থেকে ১৯৮২ সালে অবসর নেন।
তিনি এক সময় সাহিত্য চর্চা করতেন। তাঁর পিতা এ ব্যাপারে তাঁকে উৎসাহ দিতেন। তিনি দুটি কাব্যগ্রস্থ রচনা করেন। ‘জীবন কাব্য’ গ্রন্থে তিনি ব্যক্ত করেছেন সমাজ জীবন পর্যবেক্ষণ ও জীবন মরণ দর্শণের কথা এবং ‘পাগল’ কাব্যগ্রন্থে আধ্যাত্মিক বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ তাঁর এই দুই কাব্যগ্রন্থ দ্বয়কে কেউ মুল্যায়ন করেনি। পরবর্তীতে স্বনামধন্য সাহিত্যিক অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ মৃত্যুর পূর্বে মাহমুদা রহমানের ‘পাগল’ কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর চিঠিতে যা ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ১৯৭৮ সালে(২৬ চৈত্র, রবিবার, ১৩৮৪) প্রকাশিত হয়েছিল।


error: Content is protected !!