দীর্ঘ হচ্ছে বুভুক্ষু মানুষের লাইন

ঢাকা : করোনাভাইরাসে দেশজুড়ে চলছে অঘোষিত লকডাউন। কর্মহীন হয়ে পড়েছে শহরের ভাসমান মানুষ। রোজগার না থাকায় অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণির এই কর্মজীবীদের পরিবারের সদস্যরা দিনাতিপাত করছে অনাহারে-অর্ধাহারে। প্রতিদিন বাড়ছে এদের সংখ্যা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে, ফুটপাতে এবং ফ্লাইওভারের নিচে এসব দরিদ্র মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে ত্রাণের আশায়।

রোববার (৬ এপ্রিল) দুপুর ১২টা। একজন দুজন করে মানুষ জমছে মতিঝিল-কমলাপুরের কাছাকাছি গোপীবাগে সাদেক হোসেন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে। এখানে দুপুরের দিকে ত্রাণ দেওয়া হবে— এ সংবাদে আশপাশ এলাকার দরিদ্ররা আসছেন।

কথা হয় টিটিপাড়া এলাকায় রাস্তার ধারের বস্তিতে থাকা নিলুফা বেগমের সঙ্গে। মধ্যবয়সী এ নারী জানান, গত কয়েকদিন বাসায় খাবারের সংকট। পাঁচ সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাতে কখনো রাস্তার ধারে অবস্থান করছেন তো কখনো এখানে ওখানে ছুটে যাচ্ছেন ত্রাণের আশায়। (রোববার) এখানে ত্রাণ দেওয়ার খবরে এসেছেন শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে। তার মতো অন্তত ৩০-৩৫ জনের মতো মানুষ কমিউনিটি সেন্টারের দুই গেটের সামনে অবস্থান নেন।

সাহাব উদ্দিন (৬২) নামে একজন জানালেন, তিনি সকাল ১০টার দিকে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে খবর পেয়ে তখনই চলে এসেছেন।

কথা হয় আয়োজকদের একজন আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, স্থানীয় কয়েকজন যুবক মিলে ব্যক্তি উদ্যোগে এ ত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন। তারা দুপুরের পর সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে ৫০ জনের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। তাদের সহায়তার মধ্যে প্রতি ব্যাগে ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ২ কেজি আলু ও ১/২ কেজি তেল দেওয়া হচ্ছে।

রোববার (৬ এপ্রিল) গুলিস্তান গোলাপ শাহ্ মাজার, হাইকোর্ট মাজার, মগবাজার ওয়্যারলেস মোড়, মালিবাগ, শান্তিনগর ফ্লাইওভারের নিচে, কমলাপুর রেল স্টেশন ও কমলাপুর স্টেডিয়াম এলাকায় অপেক্ষমাণদের আধিক্য লক্ষ করা গেছে। তাদের অনেককে সড়ক বিভাজকের ওপর অবস্থান করতে দেখা গেছে। ত্রাণবাহী গাড়ি মনে হলেই হঠাৎ সড়কে নেমে পড়তেও দেখা গেছে।

সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি ঢাকার রাস্তায় এ দৃশ্য এখন নিয়মিত হয়ে উঠেছে। চাতকের মতো অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে দিন এনে দিন খাওয়া অসহায় মানুষদের। কোনো বিত্তবান মানুষ বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি বা সংগঠন ত্রাণ নিয়ে এলেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক বা শারীরিক কোনো দূরত্বই বজায় থাকছে না।

পাশাপাশি একই অবস্থা ঢাকা শহরের ভাসমান ছিন্নমূল মানুষের ক্ষেত্রেও। তাদের চাহিদা ত্রাণ নয়, তারা চায় রান্না করা খাবার।

করোনা পরিস্থিতিতে যখন ছিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষের খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে ওঠে তখন ছিন্নমূল ও ভবঘুরেদের জন্য রান্না করা খাদ্য সহায়তা নিয়ে কাজ করছেন ৬ যুবক। তাদের মধ্যে একজন গণমাধ্যমকর্মী শফিকুল ইসলাম সবুজ।

তিনি বলেন, আমি গত ৮ দিন ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষদের খাবার বিতরণ করে আসছি। আমরা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবার বিতরণ করছি। প্রথম দিকে বিচ্ছিন্ন এলাকায় বিতরণ করলেও এখন কয়েকটা এলাকাকে প্রধান্য দিচ্ছি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম এলাকা অন্যতম।

এছাড়াও গোলাপ শাহ্ মাজার, হাইকোর্ট মাজার, শান্তি নগর ফ্লাইওভারের নিচে, সদর ঘাট, কমলাপুর রেল স্টেশন এলাকায় খাবার বিতরণ করি। তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ব্যক্তি উদ্যোগে এ ত্রাণ সেবায় অংশ নেওয়া সবুজ জানান, তাদের টিমে সদস্য সংখ্যা ১০ জন। এর মধ্যে ৬ জন স্বেচ্ছাসেবী। বিতরণও তারা করে। আর ৪ জন বাবুর্চি রান্না করেন।

টিমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আরেক গণমাধ্যমকর্মী সোহাগ খান, তিনি একজন ব্যবসায়ীও। সোহাগ খান বলেন, আমরা প্রতিদিন ৩০০ লোককে খাবার দিয়ে থাকি। আমরা একদিন খিচুরি, অন্যদিন তেহারি— এইভাবে খাবার দিয়ে আসছি। আজ স্টেডিয়াম এলাকার ছিন্নমূলদের আবদারে সাদা ভাত দিচ্ছি। প্রতিদিনের খাবার ও আনুষঙ্গিক সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার টাকার মতো খরচ হয়।

তিনি জানান, আমাদের এখন পর্যন্ত কোনো ডোনার নেই। আমরা নিজেরাই এ অর্থের জোগান দিচ্ছি।

সমাজের বিত্তবানদের এই পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন তারা। বিত্তবানরা নিজেরা বের না হলেও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা করা উচিত বলেও মানে করেন তারা।

এদিকে করোনা বিস্তার রোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে রাজধানীসহ পুরো দেশ রয়েছে অঘোষিত ‘লকডাউন’ অবস্থায়। ইতোমধ্যে তৃতীয় দফায় ছুটি বাড়ানো হয়েছে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

ছুটি ঘোষণারপর থেকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নাগরিকদের ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে। দুজনের একসঙ্গে চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত সর্বশেষ ২০১৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনে সাড়ে ৬ লাখের মতো মানুষ বস্তিতে বসবাস করছেন।

জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় ভাসমান শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেড় লাখ। রিকশাচালক ও গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত আছে আরো ৬ লাখ মানুষ। এর বাইরে বিভিন্ন পেশার স্বল্প আয়ের মানুষ আছে প্রায় ১৬ লাখ। এদের অধিকাংশেরই প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের প্রত্যেকের আয় রোজগার বন্ধ।