বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০, ৫ কার্তিক, ১৪২৭, ৩ রবিউল আউয়াল, ১৪৪২
বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০

উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞের মত: যবিপ্রবি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম ‘অত্যন্ত উঁচু মানের’ 

উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞের মত: যবিপ্রবি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম ‘অত্যন্ত উঁচু মানের’ 
 যশোর : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে চলমান নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রমকে ‘অত্যন্ত উঁচুমানের’ বলে মত দিয়েছেন উচ্চপর্যায়ের একজন বিশেষজ্ঞ; যিনি আমেরিকান একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট হিসেবেও কর্মরত।
এই বিশেষজ্ঞ এমন এক সময় যবিপ্রবি ল্যাব পরিদর্শন করলেন, যখন এখানকার পরীক্ষার মান নিয়ে সমাজে জোর বিতর্ক চলছে।
আজ প্রায় চার ঘণ্টা ওই বিশেষজ্ঞ যবিপ্রবি জেনোম সেন্টারে অবস্থান করে সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা পরীক্ষার কাজ সরেজমিনে দেখেন। এই সময় তিনি পরীক্ষা কাজে নিয়োজিতদের কাছে অন্তত ২০০ প্রশ্ন করেন।
পরে জানতে চাইলে ওই বিশেষজ্ঞ সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে এটুকু বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, এখানে অনেক স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে কাজ করা হচ্ছে।’ এখানকার পরীক্ষায় তিনি কোনো অসঙ্গতি পাননি; পরীক্ষার কাজে নিয়োজিতদের দক্ষতা-যোগ্যতা নিয়েও তার মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়নি বলে জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। রাতে আলাপকালে যবিপ্রবি উপাচার্য তার জেনোম সেন্টারের কাজ নিয়ে আরো কিছু তথ্য দেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা পরীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই দৃশ্যত স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী বেশ কয়েক ব্যক্তি আড়ালে-আবডালে নেতিবাচক কথাবার্তা বলা শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, এই ল্যাবে বেশি বেশি পজেটিভ রেজাল্ট আসছে। আর খুলনা মেডিকেল কলেজ ল্যাবে অনেক কম পজেটিভ আসছে। যদিও এই বিষয়ে তারা কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটির কথা কখনো বলেননি।
কার্যত এই কারণে গেল কিছুদিন ধরে যশোর থেকে সংগ্রহ করা নমুনার সিংহভাগই খুলনা ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে প্রায় সবই নেগেটিভ ফল আসছে এবং বিষয়টি নানা মহলে তুলে ধরে মহলবিশেষ যবিপ্রবি ল্যাবের পরীক্ষাকে ‘ভুয়া’ প্রমাণের চেষ্টাও করছেন।
গেল শুক্রবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বাস্থ্যকর্তারা রাখ-ঢাক না করে যবিপ্রবি ল্যাবের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন। এমনকি সভায় উপস্থিত কেউ কেউ যবিপ্রবি জেনোম সেন্টারে পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও তোলেন।
ওই সভায় উপস্থিত প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য ল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ না করে সেখানে কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটি আছে কি-না দেখার জন্য ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ পাঠাতে অনুরোধ করেন স্বাস্থ্য সচিবকে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফুল ইসলাম যবিপ্রবি জেনোম সেন্টার সরেজমিন পরিদর্শন করলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল দশটায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে ঢোকেন সিডিসি’র বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফুল ইসলাম। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে অবস্থান করেন। ওই সময়কালে তিনি সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের কাছ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম দেখেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং জেনোম সেন্টারে চলমান নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রমের টিম লিডার ড. তানভীর ইসলাম জানান, বুধবার সকালে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর পক্ষ থেকে কাজী সাইফুল ইসলাম নামে একজন এক্সপার্ট যবিপ্রবিতে আসেন।
ড. তানভীর বলেন, ‘ল্যাব পরিদর্শনকালে তিনি আমাদের কাছে কীভাবে নমুনা পরীক্ষা করা হয়, তার খুঁটিনাটি জানতে চান। এসময় আমরা তাকে কীভাবে নমুনা থেকে ভাইরাস অকার্যকর করে তা থেকে আরএনএ বের করে পিসিআর মেশিনে দেই তা ব্যাখ্যা করি।’
ড. তানভীর বলেন, ‘বিশেষজ্ঞের কাছে আমরা সিভিল সার্জন অফিসের পক্ষ থেকে যে প্রক্রিয়ায় নমুনা সরবরাহ করা হয় তার সবিস্তার ব্যাখ্যা তুলে ধরি। নরমাল স্যালাইনের মধ্যে স্যাম্পল সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে আমাদের আপত্তির বিষয়েও তিনি একমত হন। এ ক্ষেত্রে ভিটিএম-এর মাধ্যমে স্যাম্পল সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দেন তিনি।’
‘প্রায় চার ঘণ্টা ল্যাবে অবস্থান করে তিনি আমাদের কাছে অন্তত ২০০টি প্রশ্ন করেন। এসময় মঙ্গলবারের ৪০টি নমুনার পরীক্ষার ফলাফল কীভাবে পেয়েছি তা আমাদের এক্সপার্টরা বুঝিয়ে দেন তাকে। তিনি যবিপ্রবির ল্যাবের করোনা পরীক্ষার সার্বিক অবস্থা থেকে এক্সপার্টদের প্রশংসা করেন,’ বলছিলেন ড. তানভীর।
পরে এই বিষয়ে সিডিসির বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি সবিস্তারে বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমি আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রো বায়োলজির একজন কনসালট্যান্ট। সিডিসির সাথে কাজ করি। যবিপ্রবির জেনোম সেন্টারে করোনা রোগীর নমুনা পরীক্ষার ওপর একটি ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের জন্য এখানে আমাকে পাঠানো হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে আমি মিডিয়ার সামনে কোনো কথা বলতে পারি না।’
যবিপ্রবি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় কোনো অসঙ্গতি পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমার কাছে তা মনে হয়নি। বরং তারা অনেক স্টান্ডার্ড বজায় রেখে কাজ করছেন।’
গেল সপ্তাহ থেকে যশোরের নমুনার সিংহভাগ খুলনায় পাঠিয়ে দেওয়ায় সময় থেকে কেউ কেউ বলতে থাকেন, স্বাস্থ্য বিভাগ পরিকল্পিতভাবে যবিপ্রবি ল্যাবকে অকার্যকর করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও জেলার প্রধান স্বাস্থ্যকর্তা এই অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, তার সামনে অনেক অপশন আছে। যেকোনো ল্যাবে তিনি নমুনা পাঠাতে পারেন।
আর এই বিষয়ে যবিপ্রবি উপাচার্য দেশের অন্যতম শীর্ষ অণুজীববিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, তারা স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে কাজ করেন না। নমুনা পাঠানো বন্ধ হয়ে গেলে ল্যাবে এই সংক্রান্ত কাজ অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন এখানকার গবেষকরা তাদের নিজস্ব গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করবেন। একই সঙ্গে তিনি তার ল্যাবের পরীক্ষার মান নিয়ে আস্থাশীল এবং এই বিষয়ে যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছিলেন।
আজ ঢাকা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ যবিপ্রবি ল্যাবে পরীক্ষার মান সম্বন্ধে উচ্চ প্রশংসা করার পরও যশোর স্বাস্থ্য প্রশাসন নমুনা খুলনায় পাঠায় কি-না তা এখন দেখা বিষয়।
রাতে এই বিষয়ে আরো জানার জন্য যোগাযোগ করা হয় যবিপ্রবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যে বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তবে শুনেছি, তিনি আমাদের কার্যপদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।’
‘আমাদের জেনোম সেন্টারে সাত সদস্যের যে টিম কাজ করছে, তার মধ্যে অন্তত দুই-তিনজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তারা একেকজন পাঁচ-ছয় বছর ধরে আরএনএ নিয়ে কাজ করছেন। একেকজনের পেপার্স রয়েছে ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ হলেন ড. সমীরকুমার সাহা; যিনি ঢাকায় শিশু ফাউন্ডেশনের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই ল্যাব প্রতিষ্ঠার সময় তার ডান হাত ছিলেন ইমরান। সেই ইমরান জার্মানি থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পিএইচডি করে এসে এখন যবিপ্রবি ল্যাবে কর্মরত। আজ আসা বিশেষজ্ঞ এই টিমের কাজের প্রশংসা তো করবেনই,’ বলছিলেন ড. আনোয়ার।
এক প্রশ্নের জবাবে ভিসি বলেন, সিডিসি হলো আমেরিকান ফেডারেল গভর্মেন্টের প্রতিষ্ঠান। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সবচেয়ে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশে নতুন ল্যাব স্থাপন অথবা প্রতিষ্ঠিত ল্যাবগুলোতে বায়োসেফটি বিষয়ক সহযোগিতা করে থাকে সিডিসি।’