শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০, ১৫ কার্তিক, ১৪২৭, ১৩ রবিউল আউয়াল, ১৪৪২
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০

২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে বাংলাদেশ

২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে বাংলাদেশ
ঢাকা:প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় সভাপতিত্ব করেন ছবি : পিআইডি

ঢাকা : প্রতি উপজেলা থেকে প্রত্যেক বছর এক হাজার তরুণ-তরুণীকে চাকরি দেওয়া হবে। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে দাঁড়াবে। তখন দারিদ্র্যের হার নেমে আসবে তিন শতাংশে। একই সঙ্গে চরম দারিদ্র্যের হার ১ শতাংশেরও কম হবে। গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমে আসবে। শহুরে জীবনযাপনের সব সুবিধা পাবে উন্নত বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ। গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়াবে ৮০ বছর। মোট দেশজ উৎপাদনও (জিডিপি) বাড়বে।

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে সরকার। ওই রূপরেখা অনুযায়ী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে শুরু হবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার বাস্তবায়নের কাজ। এ ধরনের আরও তিনটি অর্থাৎ মোট চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত রূপ পাবে। এই রূপরেখার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে রূপরেখা: বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) চেয়ারপাসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনইসি বৈঠকে ওই পরিকল্পনাটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যা গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের  এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবে রূপায়ন : বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’ শীর্ষক জনঅবহিতকরণ সভায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস। সভার সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম।

প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় (২০২১-৪১) মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশ আহরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য সর্বাংশে দূর করাসহ উচ্চ আয়ের মর্যাদা অর্জনের জন্য মূল্য প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসনসংশ্লিষ্ট অভীষ্ট সামনে রেখে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এর কর্মসূচি পরিচালিত হবে। বিশেষ করে এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠান, জনসংখ্যার শতভাগ সাক্ষরতা, ১২ বছর বয়সীদের জন্য সর্বজনীন অবৈতনিক শিক্ষা, কর্মভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে আগ্রহীদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি, সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যবিমা স্কিমে সর্বজনীন অভিগম্যতা, সংগঠিত খাতে সব কর্মীকে কর্মকালীন দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যবিমার শতভাগ আওতায় আনা এবং প্রতি উপজেলা থেকে প্রতি বছর এক হাজার তরুণ-তরুণীর জন্য চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান করা।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ১২টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে  শিল্প ও বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো বিষয় যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে সুশাসন, মানব উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের মতো বিষয়গুলোও। আর সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো আছে- যাতে প্রতি অর্থবছরের অর্থনীতির সূচকগুলো লক্ষ্যমাত্রা বিস্তরিতভাবে দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, তথা রূপকল্প ২০২১-এর ধারাবাহিকতায় ২০ বছর মেয়াদি দ্বিতীয় এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রণয়ন করা এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০৪১ সালে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ৮০ বছর ধরা হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার প্রক্ষেপণে বলা হয়েছে, ২০৩১ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৯ শতাংশে। সেটি আবার বাড়তে বাড়তে ২০৪১ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। একইসঙ্গে চরম দারিদ্র্যের হার ২০২০ সালে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২০৩১ সালে পৌঁছাবে ২ দশমিক ৩ শতাংশে। সেটি পরিকল্পনার শেষ বছর ২০৪১ সালে কমে নেমে আসবে ১ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে দারিদ্র্যের হার বর্তমান বছরের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০৩১ সালে দাঁড়াবে ৭ দশমিক শূন্য শতাংশে। পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শেষে ২০৪১ সালে এ হার নেমে যাবে ৩ শতাংশের নিচে।

প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম দ্বিতীয় এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনাকে অভিহিত করছেন ‘ভিশনারি দলিল’ হিসেবে। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা মূলত একটি রূপরেখা। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশে রূপান্তরিত হতে গেলে আমরা কী কী অর্জন করতে চাই, তার বহিঃকাঠামোটি তুলে ধরা হয়েছে এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনায়। এই রূপরেখা বা কাঠামোকে কেন্দ্র করেই অর্জনগুলো বাস্তবায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।

ড. শামসুল আলম বলেন, প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মধ্যে বিস্তারিত সবকিছু আশা করা ঠিক নয়। এটি একটি দিক নির্দেশনামূলক দলিল। এর ওপর ভিত্তি করে চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। বিস্তারিত যা কিছু কৌশল, সেসব পরিকল্পনায় উল্লেখ থাকবে।

তিনি জানান, ২০ বছরের যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের সূচনা হবে ২০২১ সালে। আর এই বছরটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২০-২৫) অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার জন্য একবছর আগেই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নবম, দশম ও একাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দুই দশকের প্রেক্ষিত পরকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, যার মাধ্যমে গড়ে উঠবে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

এছাড়াও দুইটি কারণে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে বলে মন্তব্য করেন ড. শামসুল আলম।। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি ২০২১ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের শর্ত পূরণ করে, তাহলে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। দ্বিতীয়ত, ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) বাস্তবায়ন পরিমাপ করা হবে। এই অর্জনগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেই গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বিষয়টিকে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রেক্ষিত পরিকল্পনাতেও। বলা হয়েছে, শহরের সব সুবিধা পৌঁছে যাবে গ্রামে। মানুষকে আর যেকোনো প্রয়োজনে শহরে ছুটতে হবে না।

পরিকল্পনাতে বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের ৮০ ভাগ মানুষ বাস করবে শহরে। তাই গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আর থাকবে না। এর আগেই জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমেও গ্রামকে শহর বানানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও এই বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় আরও যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছ্তে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, যোগাযোগ খাতের বিশেষ উন্নয়ন, তথ্য ও প্রযুক্তি থাতের উন্নয়ন, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়। অর্থাৎ উন্নত দেশে পরিণত হতে যা যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবকিছুকেই স্থান দেওয়া হয়েছে পকিল্পনাটিতে।

এছাড়া গ্রাম-শহরের বৈষম্যের পাশাপাশি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রেক্ষিত পরিকল্পনায়। এছাড়া ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান তৈরি, রফতানি বহুমুখীকরণ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে দেওয়া হয়েছে গুরুত্ব। এর বাইরেও টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতিও থাকছে।