সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি, ১৪৪২
সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

নিরপেক্ষ আচরণ চায় তৃণমূল, বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের 

নিরপেক্ষ আচরণ চায় তৃণমূল, বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের 

ঢাকা : কেন্দ্রে অনুমোদনের জন্য জমা পড়া আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ অনেক জেলা কমিটিতে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের স্থান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি মঈনুদ্দীন মণ্ডলের বিরুদ্ধে কমিটিতে নিকটাত্মীয় পাঁচজনকে রাখার এবং নোয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে তার ছেলেকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিভিন্ন জেলার বঞ্চিত একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিষয়টি তারা দলীয়প্রধান শেখ হাসিনাকে লিখিতভাবে জানাবেন।

কমিটিতে স্বজনদের অন্তুর্ভুক্তির অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মঈনুদ্দীন মণ্ডল বলেন, ‘খসড়া কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে তারা সবাই আওয়ামী লীগ করে। দলের বাইরে কাউকে কমিটিতে পদ দেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে দলটির নোয়াখালী জেলা সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে কেন্দ্রে জমা পড়া জেলা কমিটিগুলো নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভায় দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেন। এজন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করার কথাও বলেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা মূলত অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করবেন। যোগ্য ত্যাগীদের বাদ দেওয়া হলো কি না, আত্মীয়করণ বা অযোগ্যদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হলো কি না জমা দেওয়া কমিটিগুলোর এসবই দেখবেন তারা।’
দলীয় সভাপতির কমিটিগুলো যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশনার পর তৃণমূলে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক নেতা।
তারা বলেন, জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঐকমত্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রে জমা দিলেও ভাগাভাগির কমিটি হয়েছে সেগুলো। দুজনের অনুসারীদের দিয়েই কমিটিগুলো হয়েছে। দলের অভ্যন্তরে থাকা বিরোধীপক্ষ তথা পরিশ্রমী-ত্যাগী নেতাদের একজনও ওইসব কমিটিতে জায়গা পাননি। দলীয় সভাপতির এ নির্দেশে ওইসব নেতার অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। বঞ্চিতদের এখন নেতা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে যাচাই-বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা নিরপেক্ষ থাকলেই ত্যাগী ও বঞ্চিতদের রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে যাচাই-বাছাই না করলে ‘যেই লাউ সেই কদু’ই হবে।

তৃণমূলের নেতাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে যাচাই-বাছাই করা হলে সাংগঠনিক জেলাগুলোতে দলীয় রাজনীতি শক্তিশালী হবে। দলাদলি থাকবে না। এখন দেখতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা কতটা নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করছেন। প্রত্যেক কেন্দ্রীয় নেতার কোনো না কোনো জায়গায় ‘মাই ম্যান’ থাকে। সেজন্য তারা জেলার নেতাদের ফোন করে তাকে কোন পদে বসাতে হবে সে নির্দেশ দেন। নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই হলে এ ধরনের প্র্যাকটিসও বন্ধ হবে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তারা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে তৃণমূলে গ্রুপের রাজনীতির কবর রচনা হবে। জেলা-উপজেলায় ‘দলের চেয়ে নেতা’ শক্তিশালী হওয়ার যে ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল সেটাও দুর্বল হবে।

এ প্রসঙ্গে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান বলেন, ‘টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের অভ্যন্তরে দলাদলির রাজনীতি আছে। এ কারণে সারা দেশের তৃণমূলে বঞ্চিত কর্মীর সংখ্যা অগণিত। কারণ আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব ধরে রাখার রাজনীতি সারা দেশেই চলছে। তাই নিজের লোক নেতা বানানোর প্রবণতা তৃণমূলে সবার মধ্যেই দেখা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা যেন তৈরি না হয় সেজন্য যারাই দায়িত্বে আসেন তাদের নিজের লোক প্রয়োজন পড়ে। ফলে দলের নিবেদিত কর্মী অনেকেই পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হন।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের খবর সবই রাখেন। তাই সাংগঠনিক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিটি দিলেও সেগুলোর ওপর অধিকতর যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে যাচাই-বাছাই করার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টি না থাকলে ভেস্তে যাবে শেখ হাসিনার নির্দেশনা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিই তৃণমূলের দলাদলির রাজনীতি নির্মূল করতে পারবে।’

আজমত উল্লাহ আরও বলেন, ‘গত ১০ বছরে সারা দেশে কিছু নেতা ঘরে উঠে গেছেন, রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের আবার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে।’

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক বলেন, ‘কেন্দ্র নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে যাচাই-বাছাই করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। কমিটি করার সময়ই মূলত দলাদলি-বিভক্তি শুরু হয় বাদ দেওয়া ও অন্তর্ভুক্ত করা এ ইস্যু নিয়ে। কমিটি করার সময়ে অনেক জেলার নেতারা নিজেদের দল ভারী করতে যাকে-তাকে নেতা বানানোর একটি প্রবণতা থাকেই। সেটা করা না গেলে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হবে দল।’

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা মনে করেন, তৃণমূলের কোনো কোনো কমিটি ঝামেলাপূর্ণ। এসব কমিটি ঝামেলামুক্ত করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের যাচাই-বাছাই করতে নির্দেশ দিয়েছেন। দল ক্ষমতায় থাকার কারণে বিভিন্ন দল থেকে সুবিধা নিতে অনেকেই আওয়ামী লীগে ঢুকতে চান। তারা তৃণমূলের নেতাদের নানাভাবে প্রভাবিত করে দলে ঢুকেও পড়েন। এই যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যে সে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।’

দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির কাজ হলো যেসব কমিটি কেন্দ্রে জমা পড়েছে সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়েছে কি না সেটা দেখা।

পাশাপাশি তৃণমূলের কোনো স্তরে পুরনো, ত্যাগী কোনো নেতা বাদ পড়ল কি না সেটাও যাচাই করা। অন্য আর একটি বিষয় দেখা হবে কোথাও কোনো অভিযোগ জমা পড়ল কি না সেরকম কিছু হলে অভিযোগের আলোকে তৃণমূলের ওই নেতাদের সবাইকে নিয়ে বসে অভিযোগের সুরাহা করা। এগুলো নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হবে।’