বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭, ১৬ রবিউস সানি, ১৪৪২
বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতার নেতৃত্বে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ দুই সাংবাদিক

বিকেনগর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি এরশাদ মাদবর।

শরীয়তপুর :শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিকেনগর বঙ্গবন্ধু কলেজ সংলগ্ন বাজারে জমি দখল করে রাজনৈতিক ক্লাব ঘর করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গত এক সপ্তাহে দফায় দফায় হামলা, সংঘর্ষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। অবৈধ দখল ও হামলার ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় বিকেনগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি এরশাদ মাদবরের নেতৃত্বে দুই সংবাদিকের উপর চড়াও হয়ে ধাওয়া করে। এ সময় সাংবাদিকরা একটি দোকানের ভেতরে দুইঘন্টা অবরুদ্ধ থাকে। সংবাদ পেয়ে জাজিরা থানার পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনা স্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় জাজিরা থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর প্রেসক্লাব, শরীয়তপুর ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিেেয়শন, শরীয়তপুর অনলাইন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনসহ জেলার সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা তাৎক্ষনিক এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিও জানানো হয়েছে।


জাজিরা থানা পুলিশ, আহত আইয়ূব আলী মাদবর ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাজিরার বিকেনগর বঙ্গবন্ধু কলেজ সংলগ্ন মুন্সীকান্দি গ্রামের ছলেমান মাদবর ও তার চাচাতো ভাই সোবাহান মাদবরের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছিল। গত ১৮ অক্টোবর সেই জমি দখল করে ক্লাব ঘর করবে বলে জোর পূর্বক গাছ কেটে মাটি ভরাট করে সোবাহান মাদবর ও তার লোকেরা। পরে ছলেমান মাদবর প্রতিবাদ করলে দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় ছলেমান বাদি হয়ে জাজিরা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তবে স্থানীয়ভাবে সালিশে মিমাংশার কথা বলা হলেও কোন সুরাহা হয়নি। এ বিরোধের যের ধরে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে সোবাহান মাদবরের ছেলে বিকেনগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এরশাদ, তার ভাই নাছির মাদবরসহ দলবল ছলেমান মাদবর ও তার লোকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে বলে জাজান ক্ষতিগ্রস্থরা। এ বিষয় নিয়ে আজ সোমবার সকালে জমি দখল ও হামলা-ভাংচুরের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে দৈনিক বর্তমান পত্রিকার শরীয়তপুর প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক হুংকার পত্রিকার যুগ্ম বার্তা সম্পাদক খোরশেদ আলম বাবুল ও দীপ্ত টেলিভিশন, দৈনিক খোলাকাগজ ও বাংলাদেশ পোস্টের শরীয়তপুর প্রতিনিধি রাজিব হোসেন রাজনকে বিকেনগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এরশাদ মাদবরের নের্তৃত্বে ধাওয়া দিয়ে স্থানীয় একটি দোকান ঘরে (সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত) অবরুদ্ধ করে রাখে।

এ সময় সোবাহান মাদবরের লোকেরা ছলেমান মাদবরের লোকদের ওপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাাঁধে। সংবাদ পেয়ে পরে জাজিরা থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক মফিজুর রহমান ও সামসুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল সাংবাদিকদের উদ্ধার করেন। সংঘর্ষ চলাকালে ছলেমান মাদবরের পক্ষের ইউসুফ আলী মাদবর (৬৫), আবু বকর মাদবর (৩৫), এইচএমএ কাইয়ূম মাদবর (৪৬), ছলেমান মাদবর (৭৫), আইয়ূব আলী মাদবর (৫৫), হাবিবুর রহমান আব্বাসী মাদবর (২০), আদিব মাদবর (১৪), লাকু মাদবর (৩৫) ও অপর পক্ষে নাজমা বেগম (৪২), লাভলি আক্তার (৩০), নাসির মাদবর (৪০)সহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়। আহতদের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ইউসুফ আলী মাদবর (৬৫) ও আবু বকর মাদবর (৩৫)কে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সোবাহান মাদবরের নাতি সালমুন হাওলদার (১৮) কে আটক করে জাজিরা থানা পুলিশ। এ সময় পুলিশের কাছ থেকে সালমুনকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে সোবহান মাদবরের লোকজন।


সাংবাদিক খোরশেদ আলম বাবুল ও রাজিব হোসেন রাজন বলেন, জাজিরা উপজেলার বিকেনগর মুন্সীকান্দি এলাকায় প্রভাবশালীরা জমি দখল করে ক্লাব ঘর করবে এমন সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে বিকেনগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এরশাদ মাদবরের নের্তৃত্বে সোবাহান মাদবর, নাছির মাদবর, জলিল, উজ্জল, চান মিয়া, সালমুন হাওলাদার, লাভলি, নাজমা, রিমাসহ ২০/২৫ জন দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে আমাদের উপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে আমাদের মোবাইল, ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে । শুধু তাই নয় আমাদের ধাওয়া করে, পরে আমরা স্থানীয় বাজার ব্যবসায়ী ছালাম বেপারীর টেইলার্স দোকান ঘরে আশ্রয় নেই। পরে তারা আমাদেরকে সেখানে দোকানের ঝাপ আটকে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দাবি করছি।


ছলেমান মাদবর বলেন, আমরা পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে ৬০ বছর যাবত ওই জমির ভোগ দখলে আছি। এই সম্পত্তি বাজারের নামে পেরিফেরি হচ্ছিল। আমরা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে রায় পেয়েছি। সোবাহান মাদবর ও তার লোকজন রাজনৈতিক ক্লাবঘর নির্মাণ করার জন্য জোর পূর্বক গাছ কেটে এবং মাটি ফেলে সম্পত্তি দখল করার চেষ্টা করে। গাছ কাটতে বাঁধা দিলে সোবাহান মাদবরের লোকজন আমাদের ওপর ও আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর দফায় দফায় হামলা-ভাংচুর চালায়। এ সময় আমাদের ৮-১০জন লোক আহত হয়। সকল বিষয়ের সংবাদ সংগ্রহের জন্য আজ সোমবার সকালে সাংবাদিকরা আসলে তাদের উপর চড়াও হয়ে অবরুাদ্ধ করে সোবাহান মাদবরের লোকজন। আমার এর সঠিক বিচার দাবি করছি।
সোবাহান মাদবরের ছেলে নাসির মাদবর বলেন, আমাদের জমিতে ঘর তোরার জন্য মাটি ফেলেছি। কিন্তু ছলেমান সেই জমি নিজেদের দাবি করছে। তারা আমাদের ওপর হামলা করে, বেশ কয়েকজনকে আহত হয়েছে।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম সরকার পিপিএম বলেন, সংঘর্ষ ও সাংবাদিকরে অবরুদ্ধের সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করি। অভিযোগের ভিত্তিতে এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।